শহরের বুকেই বিদ্যুৎহীন অরণ্য-যাপন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকার

নিজস্ব সংবাদদাতা:এই চড়া গরমে বিদ্যুৎ ছাড়া থাকতে পারবেন? কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক দিন? বা অন্তত এক দিন? আপনার উত্তরটা নিশ্চয়ই হবে, ‘অসম্ভব!’ কিন্তু এই অসম্ভব দিব্যি সম্ভব হয়েছে ডক্টর হেমা সানের পক্ষে। ৭৯ বছরের এই প্রাক্তন অধ্যাপিকা বিদ্যুৎ ছাড়াই দিব্যি রয়েছেন। না, দিন কয়েক নয়। সারা জীবন।

পুণের বাসিন্দা এই বৃদ্ধা মানুষটি জানিয়েছেন, প্রকৃতির প্রতি মমত্ব থেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যত কম বিদ্যুৎ খরচ, ততই ভাল প্রকৃতির পক্ষে। এটা বোঝার পর থেকেই তিনি বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে দেন বহু বছর আগে। তার পর থেকে তেমনই চলছে।অধ্যাপিকা বলেন, তিনি কখনও বিদ্যুতের অভাবও বোধ করেননি তাঁর গোটা জীবনে!করবেনই বা কেন! “খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র– এই তিনটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রধানতম প্রয়োজনীয় জিনিস। এক সময় পৃথিবীতে বিদ্যুৎ ছিল না। তখনও মানুষ বেঁচেছিল সুন্দর ভাবে। আমি এখনও ম্যানেজ করতে পারি সে ভাবেই। কোনও অসুবিধা হয় না।”

তবে অধ্যাপিকা একা নন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে একটি কুকুর, দু’টি বিড়াল, একটি বেঁজি এবং অসংখ্য পাখি। অধ্যাপিকা জানান, তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। কিছুই বা কেউ-ই আলাদা করে তাঁর নিজের নয় এই পৃথিবীতে। তিনি যে বাড়িটায় এবং যে জায়গাটা জুড়ে থাকেন, সেগুলি আসলে প্রকৃতিরই সম্পদ। “সবই তো প্রকৃতির, আমি কেবল দেখাশোনা করি।”

পুণের সাবিত্রীবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেউদ্ভিদবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছিলেন অধ্যাপিকা হেমা। তার পরে দীর্ঘ কয়েক বছর পড়িয়েছেন পুণেরইগারওয়াররের এক কলেজে। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞান কেবল তাঁর পড়ার বা পড়ানোর বিষয় ছিল না তাঁর জীবন ছিল। তাই তো বরাবরই ছোট্ট এক কুঁড়েতে বাস করেন হেমা। সেই কুঁড়ে ঘিরে রেখেছে অসংখ্য গাছ। গাছ ভরা পাখিরা তাঁর সারা দিনের সঙ্গী। সন্ধে হলেই সে কুঁড়েতে জ্বলে মাটির প্রদীপ। গাছে ঘেরা থাকায়, গ্রীষ্মের তাপ প্রবেশ করে না ঘরের ভিতর। আক্ষরিক অর্থেই যেন ‘ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়’ তাঁর।

তবে এরকম আরণ্যক জীবন কাটালেও, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে তিনি বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁর লেখা বেশ কিছু বই উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাঠ্য। এখনও দিনভর অবসরে খাতা-কলম নিয়ে সময় কাটান তিনি। লেখেন প্রকৃতির বিষয়ে একের পর এক বই। অনেকেই বলেন, প্রকৃতির প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে হেমার মতো জ্ঞান খুব কম মানুষেরই আছে। তিনি যেন কথা বলতে পারেন গাছেদের সঙ্গে, প্রাণীদের সঙ্গে।

হেমা বলছিলেন, “আমায় সবাই বোকা বলে, পাগল বলে, হয়তো আমি পাগলই। কিন্তু কিছু এসে যায় না তাতে আমার। আমি অনেকের চেয়ে অনেক ভাল আছি। এবং আমার যেমন খুশি তেমন বাঁচার অধিকারও আছে।” তিনি আরও বলেন, “আমি কখনও অনুভবই করিনি, যে আমার জীবনে বিদ্যুতের কোনও প্রয়োজন আছে। আমায় অনেকেই জিজ্ঞেস করে, আমি কী করে আছি বিদ্যুৎ ছাড়া। আমি তাদের পাল্টা প্রশ্ন করি, তারা কী করে সব জানার পরেও এত বিদ্যুৎ-নির্ভরশীল হয়ে আছে?”

কী জানার কথা বলছেন হেমা? বলছেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কথা। প্রকৃতির ফুসফুস কালো হয়ে যাওয়ার কথা। এত দূষণ, এত ক্ষতি জেনেও কী ভাবে মানুষের মতো বুদ্ধিমান একটি প্রজাতি জেনেশুনে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত, তা বুঝতে পারেন না হেমা। “আমি বলছি না, সকলকে আমার মতো করে ভাবতে হবে বা বাঁচতে হবে। কিন্তু কই, কোনও সচেতনতা তো দেখি না কারও মধ্যে!”

“এই পাখিরা আমার বন্ধু। রোজ জানলায় এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। আমায় সবাই বলে, আমি এই বাড়ি -জমি বিক্রি করে দিই না কেন। বলে, আমি অনেক টাকা পেতে পারি এগুলো বিক্রি করলে। কিন্তু বিক্রি করে দিলে এই গাছ-পাখিগুলোর দেখাশোনা কে করবে? তা ছাড়া আমি তো এদের ছেড়ে অন্য কোথাও যেতেই চাই না। আমি তো এদের সঙ্গেই খুব ভাল আছি।”– ভাল থাকার সহজপাঠ আরও সহজ করে বুঝিয়ে দেন হেমা।

তবে প্রকৃতি রক্ষার জন্য মানুষদের আলাদা করে কোনও বার্তা দিতে চান না হেমা। তিনি বলেন, “আমি আর কী শেখাব, আমি তো এখনও শিখছি।” তাঁর শেখার মূলমন্ত্র হিসেবে, উচ্চারণ করেন গৌতম বুদ্ধের বিখ্যাত উক্তি। “নিজের বেঁচে থাকার পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।” যেমনটা খুঁজে নিয়েছেন হেমা, প্রকৃতির মাঝে।