আব্বাস সিদ্দিকী ও বাংলার রাজনীতি

আব্বাস সিদ্দিকী ও বাংলার রাজনীতি

লিখছেন বিখ্যাত লেখক হাদিউজ্জামান

ফুরফুরার আব্বাস সিদ্দিকী স্বল্পযোগ্য ব্যক্তি, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর ডাকে ২০—২৫ লক্ষ মানুষ জড়ো হন, এটা তো প্রমাণিত সত্যি। একজন তরুণ ও স্বল্পযোগ্য নেতার আহ্বানে এত অধিক সংখ্যক মানুষের সাড়া দেওয়ার পিছনের রহস্যটা কী? রহস্যটা হলো, ফুরফুরার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ‘দাদা হুজুর’-এর প্রতি, তাঁর পরলোকগমনের বহুবছর পরেও, বাংলার আমজনতার অন্তরে বিদ্যমান থাকা বিরল শ্রদ্ধা ও অসীম ভক্তি। আর ভক্তবৃন্দের এই বিরল শ্রদ্ধা ও অসীম ভক্তিই তো এখন, শুধু আব্বাস সিদ্দিকীরই নয়, সর্বস্তরের নেতাদেরও, মূল ও অমূল্য পুঁজি। পিতৃপুরুষের রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তির বহর, ‘নলেজ সিটি’ করতে গিয়ে, হঠাৎ করে ঠাহর করা গেলে, মাথা ঘুরে যেতে পারে যে-কোনও তরুণের, স্বাভাবিক। এটাই হয়েছে। এটাই হচ্ছে। অথচ হওয়ার দরকার ছিল অন্যরকম কিছু। কীরকম?

আশা করছি, নিরপেক্ষ মন নিয়ে ভেবে দেখবেন : আব্বাস সিদ্দিকী রাজনীতি নিয়ে যে অবস্থান নিয়েছেন, অনেকের কাছেই সেটা সমর্থনযোগ্য। শুধু তাই নয়, সমর্থকদের মতে, এটা অনেক আগেই হওয়ার দরকার ছিল। ইতিপূর্বে মুসলিম সমাজের কতিপয় নেতা চেষ্টাও করেছেন এপথে হাঁটার। কিন্তু সফল হননি, কারণ তাঁদের জমি তৈরী নেই। আব্বাস সিদ্দিকীর প্লাস পয়েন্ট, তিনি পিতৃপুরুষের তৈরী জমি পেয়েছেন (উল্লেখ্য তাঁর পিতৃপুরুষেরা অবশ্য রাজনৈতিক জমি তৈরি করেননি কখনোই)। কিন্তু তাঁর মাইনাস পয়েন্ট, যোগ্যতার স্বল্পতা। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে। তবুও তিনি একই বিষয়ে বারবার বিতর্কিত মন্তব্য করেন, কারণ জমির দখল ধরে রাখা। যেহেতু জমি তিনি নিজে তৈরী করেননি, পিতৃপুরুষের ‘পারিবারিক সিলসিলা’র জমিতে রাজনীতির চাষ করতে নেমেছেন, তাই সহ-শরিকদের চেয়ে তাঁর অধিকার বেশি, এটা প্রমাণ করার জন্য, তাঁকে পিতৃপুরুষের নামে অতিরঞ্জিত ভক্তি দেখাতে হচ্ছে, যাতে ভক্তদের মনোরঞ্জন হয় এবং তাঁর পিছনে তাদের অবস্থানও অটল থাকে। কিন্তু, ভিতরে ভিতরে বাংলার মাটিতে একটা শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, যারা অন্ধভক্তির সঙ্গে কখনোই আপোষ করতে পারে না বরং সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলতেই অভ্যস্ত। এদের কথাও আব্বাস সিদ্দিকীর মাথায় রাখা দরকার ছিল। এর চেয়ে অনেক বেশি দরকার ছিল, ফুরফুরার প্রবীণ ও যোগ্য আলেমদের পারস্পরিক রেষারেষি উপেক্ষা করে, সমাজের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ময়দানে নামা। কিন্তু এমনটা হয়নি। আর হয়নি বলেই আজ তাঁদের কাছেও চরম বিড়ম্বনাময় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন আব্বাস সিদ্দিকী।

মোদ্দাকথা : আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক অবস্থান সমর্থনযোগ্য কিন্তু তাঁর পিতৃপুরুষের বিষয়ে অতিরঞ্জিত মন্তব্যগুলো অসমর্থনীয়। সুতরাং তাঁর উচিত এমন মন্তব্য থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সচেতন মানুষদের উচিত তাঁকে নিয়ে ‘খিল্লি’ বা বিদ্রূপ না করা বরং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁকে আরও পোক্ত হতে সহযোগিতা করা। সবচেয়ে ভালো হয়, সময়ের দাবি অনুসারে, যদি ফুরফুরার বর্তমান মুরুব্বিগণ সবাই সম্মিলিত হয়ে একযোগে ময়দানে নামতে পারেন, তাহলে বাংলার বাতাবরণে পুরোপুরি পরিবর্তন আসবে, ইন শা আল্লাহ্।