বুদ্ধবাবুকে খোলা চিঠি বৈশাখীর

 

পিএম নিউজ ডেস্ক: শ্রদ্ধেয় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাশয়, সালটা ২০০৮ আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন থেকেই আমার অভ্যেস ছিল স্কুল যাওয়ার আগে খবরের কাগজে ছবি দেখে হেডলাইন্স পড়া। তখন হেডলাইন্স জুড়ে শুধুই নন্দীগ্রামের খবর বাচ্চাদের কেটে কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া, ট্রাকে করে লাশ নিয়ে যাওয়া, তাপসী মালিক, মমতার অনশন ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন খুব রাগ হয়েছিল আপনার ওপর। আপনার রক্তমাখা ছবি দিয়ে ব্যানার বানিয়ে ‘বুদ্ধ যুদ্ধ’ লিখে বুদ্ধিজীবীরা মিছিল করেছিল সেই ছবি খবরের কাগজে দেখে উপলব্ধি করেছিলাম ঠিকই তো এই লোকটা মোটেই ভালো লোক নয়!
কেটে গেল দুটো বছর । ২০১০ সাল,ফার্স্ট ডিভিশনে মাধ্যমিক পাশ করলাম। আগের তুলনায় অনেকটাই বুঝতে শিখেছি তবুও খবরের কাগজ দেখার অভ্যেসটা বদলায়নি । হেডলাইন্সে যতই সিঙ্গুর – নন্দীগ্রামের খবর ও ছবি দেখতাম ততই আপনার প্রতি ক্ষোভ বেড়ে যেত। বাবাকে বলতাম মূখ্যমন্ত্রী খুব খারাপ লোক, বাবা রেগে যেতেন ।

আরও একটি বছর কেটে গেল। ২০১১ সাল যেদিন ভোটের রেজাল্ট বেরয় এবং আপনার সরকারের পতন হয় সেদিন বাড়িতে রান্না হয়নি, মা-বাবা সারাদিন না খেয়ে রয়েছেন ( আমার আর ভাইয়ের খাওয়ারটা বাইরে থেকে এনে দিয়েছিলেন) বাড়িতে কেমন একটা থমথমে ভাব, শুধুই বিষন্নতা! কাকুরা এসে বাবার সাথে গল্প করছেন -“বুদ্ধবাবু যদি পুলিশ দিয়ে অনশন মঞ্চ ভেঙে দিতেন তবে সরকারটা থেকে যেত,বুদ্ধবাবুর ভুলের জন্যই আজ এই দিন দেখতে হল”। শুনে আমি মনে মনে বলেছিলাম বেশ হয়েছে ।

সরকার গঠনের দু’বছর কেটে যাওয়ার পর প্রকাশ্যে এল তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি । সারদা কেলেঙ্কারী, টেট কেলেঙ্কারী, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, তোলাবাজী ইত্যাদি ইত্যাদি । তখন আপনি নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন -“মানুষ একদিন আস্তে আস্তে সব বুঝতে পারবে,সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই”। আপনার এই কথাতে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে । এরপর যখন নারদা ঘুষ কেলেঙ্কারী, পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের সন্ত্রাস, বুথ দখল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন ইত্যাদি প্রকাশ্যে এল তখন আপনার কথার প্রাসঙ্গিকতা বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, আপনিই ঠিক বাকি সব ভুল আর নন্দীগ্রামের ঘটনা পুরোটাই মনগড়া কাহিনী তৈরি করে মিডিয়ার প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছিল তৃণমূল ।

আমার ধারণা আজ সত্যি হল। আদালতে সিবিআই এর পেশ করা চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে যে,তৎকালীন নন্দীগ্রাম কান্ডে আপনি এবং আপনার সরকার কোনও ভাবেই দায়ী নয়। শুধুমাত্র মনগড়া কাহিনী তৈরি করে মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করে বাম সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাই ছিল তৃণমূলের মূল উদ্দেশ্য । কথায় আছে ‘সবুরে মেওয়া ফলে ” আজ উপলব্ধি করতে পারছি আপনি ওইদিন চাইলেই অনশন মঞ্চ ভেঙে দিতে পারতেন কিন্তু কেন ভাঙেননি! আপনিই দেখিয়ে দিলেন যে, বামপন্থীরা মচকালেও ভাঙেনা, মাথা উঁচু করে বাঁচে । আপনার ধুতিতে রক্তের দাগ নেই স্যার, রক্তের দাগ রয়েছে মিডিয়া আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের বুকে। বামপন্থীরা ক্ষমতায় নেই তাই বাঙালি স্পর্ধা হারিয়েছে, আদালতের রায়ে বাঙালি আবার স্পর্ধা ফিরে পেল যার কাণ্ডারী আপনি। কথা দিলাম আমরা লড়াই করে আবার জয় ছিনিয়ে আনবই। আপনার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
বৈশাখী(টুসি)