সিরিয়ালে বুকের বিভাজিকায় রবীন্দ্রসংগীতের লাইন; প্রতিবাদ করে বিতর্কের মুখে ঐক্য বাংলা

নিজস্ব সংবাদদাতা , কলকাতা: নেটফ্লিক্স এর ওয়েব সিরিজ ‘গিলটি’ তে অভিনেত্রী কিয়ারা আডবাণীর বুকের বিভাজিকায় ট্যাটু আকারে ব্যবহার হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের লাইন “একলা চলো রে”। গত শুক্রবার 13 ই মার্চ সন্ধ্যায় তাদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরে বাংলার সর্বপ্রথম মুক্তপন্থী বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘ঐক্য বাংলা’। তারা প্রশ্ন তোলে – কিছুদিন আগে রবীন্দ্রভারতী কাণ্ডে পিঠে অশালীন শব্দের সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতের লাইন জুড়ে লেখার কারণে অল্প বয়সী ছাত্রীদের ওপর সামাজিক মাধ্যমে খাপ পঞ্চায়েত বসানো হয়, তাহলে এক্ষেত্রে রবীন্দ্রপ্রেমী বাঙালি সমাজ থেকে প্রতিবাদ উঠবে না কেন?

এই সেই বিতর্কিত ছবি

এর পর থেকেই ‘ঐক্য বাংলা’র এই ফেসবুক পোস্টের ব্যাপক সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। ওঠে নারীবিরোধীতার অভিযোগ। শরীরের কোন অংশেরই কোন বিশেষ তাত্পর্য নেই, তাই শরীরের কোন অংশেই ওই লাইনগুলি লেখার মধ্যে কদর্য কিছু নেই – মূলত এই ছিল সমালোচনার উপজীব্য। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন – নারীর বুকের বিভাজিকা আপত্তিকর জায়গা কিভাবে ? এক ব্যক্তি লেখেন, “ওটা আপত্তিকর কে বলল? নারীর স্তন সৌন্দর্যের এক অংশ , আর সেটা দেখতে সামন্তবাদী চোখ অভ্যস্ত নয়।” কেউ আবার বলে ওঠেন, “কোন পুরুষের বুকে ওই ট্যাটু থাকলে কি সমালোচনা হত?” কারো মতে, একজন নারীর বুকের খাঁজে ওই ট্যাটু আসলে রবীন্দ্রনাথকে বুকে ধরার রূপক, এর সাথে যৌন সুড়সুড়ির কোন সম্পর্ক নেই।

শনিবার ১৪ই মার্চ সকালে একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে এই সমস্ত সমালোচনার জবাব দেন ও সংগঠনের অবস্থান স্পষ্ট করেন ‘ঐক্য বাংলা’ সংগঠনের প্রধান মুখ ও সাধারণ সম্পাদিকা শ্রীমতী সুলগ্না দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, “ক্লিভেজে ট্যাটুর মাধ্যমে রবীন্দ্র সঙ্গীতের লাইন ইচ্ছাকৃতভাবেই লেখা হয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবং যৌন সুড়সুড়ির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য – যেটা বিজ্ঞাপন / চলচ্চিত্র জগতে দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে – এতে নতুন কিছু নেই ।” ঐক্য বাংলার মুক্ত পন্থী সত্তার উপর জোর দিয়ে সুলগ্না দেবী তুলে ধরেন মুক্তপন্থী আদর্শের মূলনীতি – ব্যাক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নাতীততার কথা। তাঁর মতে, “কোন কিছুর নিন্দা করা, আর সেটা করার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাওয়া – এক নয়।” এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জানান, ব্যবসায়িক যৌন সুরসুরিতে রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহারের স্বাধীনতা সকলের থাকলেও এই নোংরা কাজের তীব্র নিন্দা জানানো যে কোন বাঙালির দায়িত্ব বলে ঐক্য বাংলা মনে করে।

কিন্তু এই অবস্থান কি নারীস্বাধীনতা বিরোধী নয়?

উত্তরে সুলগ্না দাশগুপ্ত পরিষ্কার জানান , “একজন মুক্ত পন্থী হিসেবে আমার কাছে সর্বোচ্চ আদর্শ ব্যক্তিস্বাধীনতা ।‌ এই আদর্শের জায়গায় আমার কাছে কোনো আপোষ নেই । একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারী স্বেচ্ছায় তার ক্লিভেজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ কেন , যে কোন কিছুই করতে পারেন যতক্ষণ না সেটা অন্যের স্বাধীনতায় বাধা দিচ্ছে।”

তাহলে কি ব্যবসায়িক ব্যবহারের প্রশ্নে আপত্তি?

এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি আবারও ফিরে যান মুক্ত পন্থার মূল আদর্শে – ব্যক্তিস্বাধীনতা। তিনি স্পষ্ট ভাবে বলেন, যে অভিনেত্রীরা পয়সার বিনিময়ে নিজেদের যৌনতা কে ব্যবহার করছেন, যে পরিচালক প্রযোজকরা ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক ভাবে এই কাজ গুলির পরিচালনা করছেন এবং যে দর্শক পয়সা খরচা করে এইগুলো দেখছেন, যদি সেইগুলো সব স্বেচ্ছায় হয়, তবে তাতে বাধা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না কারণ এটা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন, এইগুলো কোনোটাই অপরাধ নয় ।

তাহলে আপত্তিটা কোথায়?

সুলগ্না দেবী জানান , “নৈতিক জায়গা থেকে‌ বলব যেটা অপরাধ সেটা হচ্ছে মিথ্যাচার । নেটফ্লিক্স কান্ডে বহু মানুষ বলতে শুরু করেছেন – এখানে কোনো যৌন‌ সুড়সুড়ির ব্যবসায়িক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় না। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।”

রবীন্দ্রভারতী কান্ডের প্রশ্নে কী অবস্থান জানতে চাইলে সুলগ্না দেবী বলেন ঐক্য বাংলার মতে ছাত্রছাত্রীরা যে কাজ করেছিলেন তা কুরুচিপূর্ণ কিন্তু অপরাধযোগ্য নয়। তাঁর ব্যাখ্যায় , “কুরুচিপূর্ণ কাজ করার ব্যক্তি স্বাধীনতা আমাদের সবার আছে।” কিন্তু তিনি আরো বলেন রবীন্দ্র ভারতী কান্ডের বিরোধিতা করা যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বাঙালির দায়িত্ব বলে ঐক্য বাংলা মনে করে।

ঐক্য বাংলা কি নারী বিরোধী? একজন নারী হিসেবে এই অপবাদ কে আমল দিতে চান না সুলগ্না। “একজন নারী এবং ঐক্য যোদ্ধা হিসেবে বলছি – আমরা নারীবিরোধী এই অপবাদ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে হ্যাঁ, ঐক্য বাংলা কোন নারীবাদী বা প্রগতিশীল সংগঠন নয়। ঐক্য বাংলা একটি মুক্তপন্থী সংগঠন। মুক্তপন্থা ব্যক্তির অধিকারকে স্বীকার করে, কোন লিঙ্গের কোন বিশেষ অধিকারকে নয়। সুতরাং – নারীরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে – এই ধরনের কোন লিঙ্গ বৈষম্য মূলক ভাবধারাতে ঐক্য বাংলা বিশ্বাস করে না,” বলেন তিনি।

তিনি আরো জানান, যে শত শত মানুষের বিরোধিতা মূলক মন্তব্য ঐক্য বাংলা এবং তার সদস্যরা সামাজিক মাধ্যমে পেয়েছেন, তারমধ্যে নারীদের কাছ থেকে আসা মন্তব্যের সংখ্যা শূন্য। “এথেকেই প্রমাণ হয় নারীবান্ধবতার ছলে নারীদের কি করা উচিত না উচিত সে ব্যাপারে এখনো ফরমান জারি করতে পছন্দ করেন পুরুষ সমাজের একাংশ,” সুলগ্নার দাবি।

উল্লেখ করা দরকার নেটফ্লিক্স বিতর্ক চলাকালীন ঐক্য বাংলা পেজ থেকে প্রকাশিত হয় একটি বিস্ফোরক মন্তব্য, “যারা মনে করেন ক্লিভেজে যৌনতা নেই, তারা আশা করি অযাচিতভাবে কোন মহিলার ক্লিভেজে হাত দেওয়া কে যৌন হেনস্থা মনে করেন না।”

এই অভাবনীয় মন্তব্যের ব্যাখ্যা কি? সুলগ্না জানান, “আমরা নারী বিরোধী নয়, মিথ্যাচার বিরোধী।” “কেউ যদি দাবি করতে চান নারী এবং পুরুষের বুকে কোন তফাৎ নেই তাহলে সেই ব্যক্তির নারীর বুকে অযাচিতভাবে হাত দেওয়াকে যৌন হেনস্থা হিসেবে ধরার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামা উচিত। কথায় আর কাজে ফারাক রাখে মিথ্যাচারী,” বিস্ফোরক উচ্চারণ সুলগ্নার।

সুলগ্না ও ঐক্য বাংলার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন বিখ্যাত কবি অনির্বাণ ধরিত্রিপুত্রও। সুলগ্না দেবীর অবস্থানকে “যথাযথ, ভারসাম্য যুক্ত এবং সময় উপযোগী” আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, “অন্যের শ্রদ্ধার বিষয়কে অশ্রদ্ধেয়ভাবে উপস্থাপিত করাই অন্যকে আঘাত করা। আঘাত করলে প্রত্যাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সেটাকে তালিবানী বা ফ্যাসিবাদী ব’লে উড়িয়ে দেওয়াটা হাস্যকর।”

গত এক মাসের আত্মপ্রকাশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সপ্তাহ, পথে নেমে একুশে ফেব্রুয়ারি ইত্যাদি থেকে শুরু করে একের একের পর অভিনব কর্মসূচি পালন করছে বাংলার সর্বপ্রথম মুক্তপন্থী বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘ঐক্য বাংলা’। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এই সাহসী প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে এই শিশু সংগঠনের ছোট্ট ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। এখন দেখার বিষয়, তারা এই সমালোচনার ঝড় কাটিয়ে উঠে গঠনমূলকভাবে এই ইস্যুতে এবং অন্যান্য ইসু তে কাজ করে মানুষের মন জয় করে নিতে পারে কিনা।