হিন্দুত্ববাদী সংগঠন RSS এর ধর্মীয় উস্কানিতে হাড়োয়ার চৌহাটা স্কুলে সরস্বতী পূজা বন্ধ

সাইফুদ্দিন মল্লিক : উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়ার চৌহাটা আদর্শ বিদ্যাপীঠে প্রায় ৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সরস্বতী পুজো।  স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে আভিভাবকরা আন্দোলন করছেন স্কুলে ফের সরস্বতী পুজোর আয়োজন করার জন্য।  পড়ুয়ারা রাস্তা অবরোধ করেছে, স্থানীয় থানা ও প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে ডেপুটেশনও দিয়েছে।  এটা দিল্লি থেকে রাজ্য রাজনীতি এবং মিডিয়াতে হট খবর। ঘটনাতে সর্ষের মধ্যে ভূত নিহিত আছে।

স্কুলের জন্ম থেকে ৫০ বছর ধরে পূজা হয়ে আসছে কিন্তু এমন কি ঘটলো সরস্বতী পূজা বন্ধ করতে হলো স্কুল কমিটিকে! এই প্রশ্ন জাগেনি আমাদের মনে ? ঘটনাতে সমস্ত মূল মিডিয়া মুসলিমদের অসহিষ্ণু প্রচার করছে এবং রাজ্য সরকারের দুর্নাম। বাংলাকে পাকিস্তান ও মুসলিমরা জেহাদী হয়ে গেছে। RSS এর সাম্প্রদায়িক বিষ সরস্বতী পূজা বন্ধ করেছে সেই ঘটনা আমাদের অজানা এবং মিডিয়া লুকায়িত করেছে ইচ্ছা করেই বলা যায়। হাওড়া জেলার “তেহট্ট হাই স্কুলের” মতো উগ্র  হিন্দুত্ব বিষ আছে মূল ঘটনাতে।

জন্মলগ্ন ১৯৫৯ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত এই স্কুলে সরস্বতী পুজো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন RSS এর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উস্কানির পর থেকে স্কুলে সরস্বতী পূজা বন্ধ। চৌহাটা স্কুলে ৭০ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করে। স্কুল তৈরির পর থেকে ৫০ বছর সরস্বতী পূজা হয়ে আসছে এবং মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা অর্থ ও শ্রম দিয়ে পূজা উৎসব পালন করে আসছে। ২০১২ সালে মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন করেন সম্প্রীতি বাড়াতে নবী-দিবস পালন করতে চাই আমরা। পরিচালন কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার সরকার আন্তরিকতার সাথে নবী-দিবস পালন করার অনুমতি দেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আনন্দের সঙ্গে নবী-দিবসের আয়োজন করতে শুরু করে।

স্কুলে ইসলামিক অনুষ্ঠান হবে খবর শুনে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ স্কুলে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা বলেন নবী-দিবস হলে সম্প্রীতি নষ্ট হবে। উনাদের মধ্যে কিছু অভিভাবকরাও ছিলেন, তারা প্রধান শিক্ষককে অনুষ্ঠান বন্ধের আবেদন করেন। প্রধান শিক্ষক স্কুলের সমস্ত শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনাতে বসেন। অধিকাংশ হিন্দু শিক্ষক অনুষ্ঠান বন্ধের সওয়াল করেন, সম্প্রীতি ভঙ্গের কথা বলেন। শিক্ষক গণেশ চন্দ্র সর্দার(ইংরেজি) প্রশ্ন তোলেন পাশের স্কুল “শালিপুরে” নবী-দিবস হয়নি আমাদের এখানে কেনো হবে ? শিক্ষিকা জয়তী গুহ(বিজ্ঞান) কেনো নবী-দিবস চালু করা হবে এটাই বুঝতে পারছি না এবং এর প্রয়োজন কেনো! প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার মন্ডল সিধান্তে বলেন, নবী-দিবস হবে। সরস্বতী পূজা,হিন্দু ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের করার অধিকার থাকলে, মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের নবী-দিবস করার অধিকার অবশ্যই আছে।  তিনি বলেন আমাদের সকলের দায়িত্ব কর্তব্য অনুষ্ঠানকে সফল করা।

নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠানের সকালে ছাত্রছাত্রীরা দেখেন, অনুষ্ঠান বন্ধ নিয়ে হুমকি স্বরূপ বিভন্ন রকম পোস্টার স্কুলের দেওয়ালে মারা হয়েছে। তাতে লেখা অনুষ্ঠান হলে ফল মারাত্মক হবে সাবধান করছি, কোন পোস্টারে লেখা স্কুলে মুসলিম মৌলবাদ অনুষ্ঠান দেওয়া হবে না। কয়েকটি পোস্টারে লেখা ছিল হত্যার হুমকি। নবী-দিবস অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই মুসলিম শিক্ষককে প্রকাশে হত্যার পোস্টার, তাতে লেখা   মুণ্ডু কাটা হবে। উক্ত ঘটনার কথা জানিয়ে প্রধান শিক্ষক প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার আবেদন করেন।

সব কিছুকে উপেক্ষা করে অনুষ্ঠান শুরু হবে তার আগেই এলাকার কারেন্ট বন্ধ করে দেয় স্থানীয়রা। ছাত্রছাত্রীরা আপদকালীন ভাবে বিকল্প ব্যবস্থা করে অনুষ্ঠান শুরু করেন। এই খবরে স্থানীয় হিন্দুরা স্কুলে জড়ো হতে থাকে এদের হিন্দু বলার থেকে RSS বলাই ঠিক হবে। হাতে লাঠি, ঝাঁটা, খুন্তি, বাঁশ নিয়ে নারী-পুরুষ উপস্থিতি। এদের একটাই দাবি মৌলবাদী অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে মুসলিমরা স্কুলে ছুটে আসে। মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হলে RSS হিন্দুরা পালিয়ে যায়। নবী-দিবস অনুষ্ঠান অসমাপ্ত হয়ে যায়। উলেখ্য স্কুল সংলগ্ন এলাকার বা গ্রাম হিন্দু প্রধান। প্রাপ্তন ছাত্র এবং এলাকার মানুষ বলেন স্কুলের শিক্ষক গণেশ স্যার RSS এর একজন প্রচারক, উনি এবং আরো কয়েকজন শিক্ষক চায়না নবী-দিবস চালু হোক। সমস্ত ঘটনাতে উনাদের ইন্ধন ছিল।

উক্তদিনে একটি ঐতিহাসিক সিধান্ত গ্রহণ হয়, স্কুলে কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে না। প্রধান শিক্ষক, হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের অভিভাবকরা, স্থানীয় প্রশাসন পঞ্চায়েত প্রতিনিধি , স্থানীয় বিধানসভা মিনাখার MLA উসারি মন্ডলের প্রতিনিধি মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল, স্কুল সভাপতি বিমল মন্ডল, হাড়োয়া থানার প্রতিনিধি সকলের সম্মতিতে একটি রেজুলেশন পাস হয়। তাতে লেখা হয় হিন্দু-মুসলিম শান্তি-ঐক্য বজায় রাখতে স্কুলে সরস্বতী পূজা এবং নবী-দিবস বন্ধ করা হলো। জেলা স্কুল শিক্ষা দপ্তরেও রেজুলেশন জমা করা হয়। উক্ত সিধান্তের পর ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় স্কুলে।

খবরে প্রকাশ পূজার দাবিতে ছাত্রছাত্রীরা রাস্তা অবরোধ করলে, দুস্কৃতকারীরা(অব্যক্ত মুসলিমরা) ছাত্রছাত্রীদের মারধর করে, ভাংচুর হয় ১৫টি বাড়ি, দুটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়(২৫ জানুয়ারি বর্তমান পত্রিকা এই খবর করেন)। হাড়োয়া ব্লক সভাপতি বিমল মন্ডল উক্ত হিংসার ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচার, ঘটনাতে বিজেপি RSS যুক্ত ওরা মিথ্যা প্রচার করছে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক হেমাংসু শেখর মন্ডল বলেন, পূজার দাবিতে বিক্ষোভে কোন গন্ডগোল ঝামেলা ও দুস্কৃতকারী হামলা হয়নি এটা বর্তমান পত্রিকার মিথ্যা প্রচার। তিনি আরো বলেন, পত্রিকার অফিসে ফোন করে অভিযোগ করেছি। স্কুল শান্তিপুর্ণ ভাবে চলছে কোন গন্ডগোল নাই। এলাকা পরিদর্শনে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের কোন চিহ্ন নাই। পক্ষান্তরে সরস্বতী পূজা শুরু করার আবেদন উঠলে, মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা নবী-দিবস শুরুরও কথা বলে। স্থানীয় লাল্টু বিশ্বাস স্কুলে ঢুকে নবী-দিবস  চালু করার কথা তোলা ছাত্রদের মারধর করে।

মূল ঘটনা ও কাহানিকে লুকায়িত করে, মিথ্যার পথ ধরে কয়েকটি প্রধান মিডিয়া ধর্মীয় উস্কানিমূলক খবর পরিবেশ করেছে। বর্তমান পত্রিকা, CN টিভি, দৈনিক যুবশঙ্খ উনারা সরকার ও মুসলিমদের উপর দোষ চাপিয়ে যাচ্ছে সরস্বতী পূজা বন্ধ নিয়ে এবং সমাজে একটা হিংসা তৈরি হচ্ছে বা উদ্দেশ্য এটাই। সংবাদমাধ্যমের ভুল খবর সমাজে হিংসা সৃষ্টি করছে।

উক্ত খবরের সূত্র ধরে রাষ্ট্রপতি থেকে দিল্লির সংসদ উত্তাল। গতকাল চার ফেব্রুয়ারি বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ চৌহাটা স্কুলের সরস্বতী পূজা বন্ধ নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত আবেদন করেছে। তাতে  উলেখ্য বাংলাতে সরকারের মদতে  মুসলিম জেহাদীরা পূজা বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য দিকে লকেট সংসদে বলেছেন বাংলা পাকিস্তান হয়ে গেছে স্কুলে সরস্বতী পূজা বন্ধ করা করা যাচ্ছে না। সত্যকে আড়াল করে ভুল ও মিথ্যা প্রচার হচ্ছে। এতে হিন্দুদের মধ্যে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক বিষ সৃষ্টি হচ্ছে।

এই ভাবে ২০১৭ সালের হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার “তেহ্ট্ট হাই স্কুলের” সরস্বতী পূজা নিয়ে রাজ্য ও দেশে ভুল প্রচার ছড়িয়েছিল বিজেপি। অমিত শাহ ও মোদি এবং বিজেপির সব নেতারা ভাষণে মাঝে মাঝে  বাংলার তেহ্ট্ট স্কুলে পূজা বন্ধের কথা বলেন এবং ধর্মীয় উস্কানি বাড়িয়ে তোলেন। সেই একরকম ঘটনা চৌহাটা নিয়ে প্রচার শুরু। তেহ্ট্ট স্কুলে ৯০ শতাংশ মুসলিম ছাত্রছাত্রী তারা নবী-দিবস শুরু করতে চেয়েছিল, শুরুর দিনে RSS হামলা করে স্টেজ ভেঙ্গে দেয়। শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয় স্কুলে। সেই সময় বিজেপি ভক্ত সব হিন্দি মিডিয়া খবর করেছিল বাংলার মিডিয়া চুপ ছিল। টানা দুই মাস স্কুল বন্ধ মাধ্যমিকের অ্যাডমিটও ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয়নি। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে, এক দৈনিকে খবর করে স্কুল চালু করা এবং সম্প্রীতি বজায় রাখা হয়েছিল। “বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চও” স্কুল চালুতে পদক্ষেপ নিয়েছিল।

উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমাজ থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে, স্কুলে সরস্বতী পূজা হবে কিন্তু নবী-দিবস পালন করা হলে আপত্তি কেনো? অধিক মুসলিম ছাত্র ছাত্রী যুক্ত স্কুলে নবী-দিবস পালন করা হলে অপরাধ হিসাবে দেখা হচ্ছে কেনো ???